যেখানে মা অভিযুক্ত ‘অবৈধ সম্পর্কে’, সেখানে কে রক্ষা করবে মানবিকতা?
শেখ মোঃ লিখন লৌহজং(মুন্সীগঞ্জ)প্রতিনিধ-
লৌহজংয়ে মাত্র দুই শতাংশ জমি এই সামান্য সম্পত্তির লোভে ছেলে নিজের বিধবা মাকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে, এমন অভিযোগে স্তম্ভিত মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের দক্ষিণ হলদিয়া ইউনিয়নের মানুষ।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো এই নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন মায়েরই আপন ভাই, যিনি প্রলোভন ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে মাকে মারধরের পথ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
লৌহজং উপজেলার দক্ষিণ হলদিয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম (৫২) একজন বিধবা নারী। স্বামী মৃত্যুর পর থেকেই তিনি নিজ উপার্জনে একটি ঘর নির্মাণ করে বসবাস করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ফাতেমার ছোট ভাই সুজন শেখ ভাগ্নে সোহেল শেখ (৩০) ও তার স্ত্রী হ্যাপি আক্তারকে প্রলোভন দেখান তার মাকে এই জমি বের করে দিলে দুই শতাংশ জায়গা তাদের করে দেওয়া হবে। এই প্রলোভনেই শুরু হয় মায়ের প্রতি নির্যাতন।
দুই বছর ধরে ফাতেমা বেগমের নিজস্ব অর্থে নির্মিত ঘরে তালা মেরে রাখে ভাই সুজন, ফলে তিনি প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন।
গত ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায়, শীতে কাতর ফাতেমা বেগম নিজের ঘর থেকে কম্বল নিতে তালা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় ছেলের বউ হ্যাপি আক্তার তাকে আটক করে অভিযোগ তোলে শাশুড়ি নাকি অন্য পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত!”
এরপর হ্যাপির ডাকে ছেলেও বাড়িতে আসে এবং মায়ের উপর এলোপাতাড়ি ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে নির্যাতন চালায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা ফাতেমা বেগমকে লৌহজং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়, বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পরপরই ছেলের বউ হ্যাপি আক্তার যৌতুকের মামলা করতে থানায় যান তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেখানে তিনি স্বামীর নয়, শাশুড়ির নামেই মামলা করেন!
এর কিছুক্ষণ পর আবার হাসপাতালে গিয়ে সেই শাশুড়িকেই তেল মালিশ করতে দেখা যায়। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মন্তব্য—
এটা যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। মাত্র দুই শতাংশ জমির জন্য মাকে অবৈধ সম্পর্কের অপবাদ দেওয়া এটা ঘৃণিত ও পরিকল্পিত।”
ভুক্তভোগী ফাতেমার মামাতো বোন খালেদা আক্তার বলেন,
আমার বোন বিধবা, নিজের টাকায় ঘর তুলেছে। ভাই সুজন ভাগ্নে ও ভাগ্নির সঙ্গে মিলে ওর জমি দখলের ফাঁদ পেতেছে। ওরা বলেছে মা অন্য পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করে এটা সম্পূর্ণ সাজানো নাটক।
আরেক আত্মীয়া আয়শা আক্তার জানান,
এদিকে ছেলে সোহেল নিজের স্ত্রীর কথায় মাকে মেরেছে। এখন ও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।”
ফাতেমা বেগম নিজেও বলেন,
আমার ভাই সুজন আমার জমি দখলের জন্য ছেলে ও ছেলের বউকে প্ররোচনা দিয়েছে। আমার নিজের টাকায় করা ঘরে দুই বছর ধরে তালা দিয়েছে ওরা। আমি বিচার চাই।
অভিযুক্ত সুজন শেখ বলেন,
আমি ঢাকায় ব্যবসায়িক কাজে ছিলাম, কিছুই জানি না।”
হ্যাপি আক্তার দাবি করেন,
আমি আমার শাশুড়িকে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখেছি। তাই ছেলেকে জানিয়েছি। আমার কোনো দোষ নেই।”
তবে স্থানীয়রা এসব অভিযোগকে ‘মনগড়া ও পরিকল্পিত’ বলে মনে করছেন।
লৌহজং থানা এসআই মো. লোকমান হোসেন বলেন,
ছেলে কর্তৃক মাকে মারধরের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত চলছে। ভুক্তভোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকায় বিস্তারিত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সমাজকর্মী ও শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন,
যেখানে মা–ছেলের সম্পর্ক জমির লোভে ভেঙে যায়, সেখানে সমাজের মানবিক মূল্যবোধ কোথায় দাঁড়াবে? ৫২ বছরের এক বিধবা নারীকে ‘অবৈধ সম্পর্কের’ অপবাদ দিয়ে মারধর এটি সভ্য সমাজে অকল্পনীয়।
মা কে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তুলে পরিকল্পিত মারধর,
যৌতুক মামলার অপব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ
এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ফাতেমা বেগম
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু পারিবারিক নির্যাতন নয়, এটি সমাজে নারী নিরাপত্তা, সম্পত্তির লোভ, এবং আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র।
Reporter Name 





















