3:29 pm, Saturday, 18 April 2026

যশোর সার্কিট হাউজে ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে সুবিধা গ্রহণকারী প্রতারক আটক জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:

  • Reporter Name
  • Update Time : 01:02:40 am, Friday, 28 November 2025
  • 92 Time View

যশোর সার্কিট হাউজে ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে সুবিধা গ্রহণকারী প্রতারক আটক

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:

যশোর সার্কিট হাউজে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সুবিধা ভোগের অভিযোগে মো. আব্দুস সালাম (৬৭) নামে এক প্রতারককে আটক করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার দুপুরে সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে পরিচয় সন্দেহজনক মনে হলে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন।

 

আটক আব্দুস সালাম মনিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের হেলাঞ্চি গ্রামের মৃত এলাহী বক্স গাজীর ছেলে। তিনি গত তিন মাসে অন্তত তিনবার সার্কিট হাউজে উঠে নিজেকে কখনো রংপুর জেলার জেলা প্রশাসক, আবার কখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত আবাসন, খাবারসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিনা খরচে গ্রহণ করতেন। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি অতীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং কোনোভাবেই তার সরকারি চাকরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই।

 

বুধবার দুপুরে সার্কিট হাউজে তার কথাবার্তা, আচরণ এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শনে অনীহা দেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন। উপস্থিত ছিলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম শাহীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মাসুম বিল্লাহ, ভারপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. জাকির হোসেন ও এনডিসি রেজওয়ান সরদার। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজ পরিচয়ের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। পরে তার গ্রামের ঠিকানা যাচাই করে জানা যায়, তিনি কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন এবং অতীতে কোনো সরকারি পদেও ছিলেন না। এতে নিশ্চিত হয় যে তিনি প্রতারণার মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করে বারবার সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন।

 

প্রশাসন মনে করছে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সেজে সার্কিট হাউজে ওঠা শুধু আর্থিক সুবিধা লাভের প্রতারণাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি অতিথিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ, খাবার ও অন্যান্য সুবিধায় প্রতারণার মাধ্যমে প্রবেশ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হওয়া, সংরক্ষিত স্থানে অযাচিত প্রবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সার্কিট হাউজের নিরাপত্তা ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

 

এদিকে আবদুস সালাম কী উদ্দেশ্যে এসব প্রতারণা করতেন, কিংবা তার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র যুক্ত আছে কিনা—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কাগজপত্রসহ জব্দ করা সামগ্রীরও বিশদ পরীক্ষা চলছে। এদিকে ঘটনাটির পর সার্কিট হাউজ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপদস্থ আমলা সেজে সরকারি সুবিধা ভোগ করতে সক্ষম হলেন। তবে অন্যরা মনে করছেন, বয়স, চেহারা, কথাবার্তার ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাসের কারণে তাকে সহজেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ভেবে নেওয়া সম্ভব ছিল।

 

জেলা প্রশাসন বলছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে অতিথিদের পরিচয়পত্র যাচাই, পদবী নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি ডাটাবেজ মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতারণার ধরন, আগের কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবশেষে দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিচয় গোপন রেখে সরকারি সুবিধা ভোগ করা এই ভুয়া ‘অতিরিক্ত সচিবের’ অভিনব প্রতারণার অবসান ঘটাল যশোর জেলা প্রশাসন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলেন এমপি ড. জালাল উদ্দীন

যশোর সার্কিট হাউজে ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে সুবিধা গ্রহণকারী প্রতারক আটক জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:

Update Time : 01:02:40 am, Friday, 28 November 2025

যশোর সার্কিট হাউজে ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে সুবিধা গ্রহণকারী প্রতারক আটক

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:

যশোর সার্কিট হাউজে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সুবিধা ভোগের অভিযোগে মো. আব্দুস সালাম (৬৭) নামে এক প্রতারককে আটক করেছে জেলা প্রশাসন। বুধবার দুপুরে সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে পরিচয় সন্দেহজনক মনে হলে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন।

 

আটক আব্দুস সালাম মনিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের হেলাঞ্চি গ্রামের মৃত এলাহী বক্স গাজীর ছেলে। তিনি গত তিন মাসে অন্তত তিনবার সার্কিট হাউজে উঠে নিজেকে কখনো রংপুর জেলার জেলা প্রশাসক, আবার কখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত আবাসন, খাবারসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিনা খরচে গ্রহণ করতেন। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি অতীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং কোনোভাবেই তার সরকারি চাকরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই।

 

বুধবার দুপুরে সার্কিট হাউজে তার কথাবার্তা, আচরণ এবং পরিচয়পত্র প্রদর্শনে অনীহা দেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন। উপস্থিত ছিলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম শাহীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মাসুম বিল্লাহ, ভারপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. জাকির হোসেন ও এনডিসি রেজওয়ান সরদার। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজ পরিচয়ের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। পরে তার গ্রামের ঠিকানা যাচাই করে জানা যায়, তিনি কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন এবং অতীতে কোনো সরকারি পদেও ছিলেন না। এতে নিশ্চিত হয় যে তিনি প্রতারণার মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করে বারবার সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন।

 

প্রশাসন মনে করছে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সেজে সার্কিট হাউজে ওঠা শুধু আর্থিক সুবিধা লাভের প্রতারণাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি অতিথিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ, খাবার ও অন্যান্য সুবিধায় প্রতারণার মাধ্যমে প্রবেশ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হওয়া, সংরক্ষিত স্থানে অযাচিত প্রবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সার্কিট হাউজের নিরাপত্তা ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

 

এদিকে আবদুস সালাম কী উদ্দেশ্যে এসব প্রতারণা করতেন, কিংবা তার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র যুক্ত আছে কিনা—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কাগজপত্রসহ জব্দ করা সামগ্রীরও বিশদ পরীক্ষা চলছে। এদিকে ঘটনাটির পর সার্কিট হাউজ এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপদস্থ আমলা সেজে সরকারি সুবিধা ভোগ করতে সক্ষম হলেন। তবে অন্যরা মনে করছেন, বয়স, চেহারা, কথাবার্তার ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাসের কারণে তাকে সহজেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ভেবে নেওয়া সম্ভব ছিল।

 

জেলা প্রশাসন বলছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে অতিথিদের পরিচয়পত্র যাচাই, পদবী নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি ডাটাবেজ মিলিয়ে দেখার প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতারণার ধরন, আগের কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবশেষে দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিচয় গোপন রেখে সরকারি সুবিধা ভোগ করা এই ভুয়া ‘অতিরিক্ত সচিবের’ অভিনব প্রতারণার অবসান ঘটাল যশোর জেলা প্রশাসন।