5:56 pm, Friday, 24 April 2026

একটি বাস্তব গল্প

সেপ্টেম্বরের সেই দিনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ ছিল গুমোট। ১৯৮৭ সাল। লাইব্রেরির শান্ত পরিবেশ আর মধুর ক্যান্টিনের আড্ডার সমান্তরালে ক্যাম্পাস তখন বা’রু’দে’র গন্ধে ভারী। ঠিক সেই সময়েই ছাত্ররাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে এক ছায়া-মানবের।

 

১৭ সেপ্টেম্বর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো। অপরাধ? সাধারণ কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, সরাসরি স’ন্ত্রা’সী কর্মকাণ্ড। কিন্তু এটা তো ছিল কেবল ভূমিকা মাত্র।

 

১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। কুয়াশাচ্ছন্ন এক ভোরে ক্যাম্পাসে পাওয়া গেল এক ছাত্রনেতার নি’থ’র দেহ। তদন্তের আঙুল উঠলো সেই বহিষ্কৃত তরুণের দিকে। এটিই ছিল রাজনীতির দাবার বোড় হিসেবে তার প্রথম ‘কি’লিং মিশন’-এর তকমা।

 

এর ঠিক এক বছর পর, ১৯৮৯ সালের ২৯ নভেম্বর, ডাকসু কার্যালয় কেঁপে উঠলো আর্তনাদে। তার নেতৃত্বে একদল স’শ’স্ত্র ক্যাডার হামলে পড়ল প্রগতির পতাকাবাহীদের ওপর। ভাঙচু’র, তাণ্ড’ব আর র’ক্তে’র দাগে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, শান্তি নয়, ক্যাম্পাস শাসনের চাবিকাঠি এখন বা’রু’দের দখলে।

 

নব্বইয়ের দশক শুরু হলো এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দিয়ে। তখনো তিনি বড় কোনো ‘ডন’ হয়ে ওঠেননি। প্রভাবশালী বলয়ের কাছে স্রেফ এক জুনিয়র ক্যাডার। রাজনীতির নিষ্ঠুর পরিহাসে একদিন জনসমক্ষেই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো তার দম্ভ।

 

মধুর ক্যান্টিনের সামনে তাকে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করা হলো। শত শত মানুষের সামনে সেই অপমানিত চোখ দুটো সেদিন হয়তো ভেতরে ভেতরে এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের নীল নকশা আঁকছিল।

 

সেই নীল নকশার বাস্তব রূপ দেখা গেল ১৯৯১ সালে।

 

দুই ছাত্রনেতার র’ক্তে র’ঞ্জি’ত হলো তার হাত। গ্রেপ্তার হলেন তিনি। কিন্তু রাজনীতির অশুভ পর্দার আড়ালের খেলুড়েরা তাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে দেয়নি। মাত্র এক বছরেই বেরিয়ে এলেন লৌহকপাট ভেঙে।

 

১৯৯২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম লো’ম’হ’র্ষ’ক এক রাত। অভিযোগ উঠলো, তিনি নিজেই দুই ছাত্রনেতাকে গু’লি করে হ’ত্যা করেছেন। কিন্তু বীভৎসতার এখানেই শেষ নয়, প্রমাণ লোপাটের জন্য লা’শ দুটি ফেলে আসা হলো একটি হলের অন্ধকার পানির ট্যাংকে। যে ট্যাপের পানি হাজার হাজার ছাত্র পান করে, সেখানে পচছিল দুই তাজা প্রা’ণে’র দেহ।

 

পুলিশি ফাইল বলছে এর আগেও ৩ আগস্ট এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ব’ন্দু’কযু’দ্ধে প্রাণ হা’রা’তে হয়েছিল তার আ’গ্নে’য়া’স্ত্রের গু’লি’তে।

 

একের পর এক পি’স্ত’ল’বাজি আর স’শ’স্ত্র সং’ঘ’র্ষ তাকে ১৯৯৩ সালে পুনরায় রিমান্ডের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এবার আর সহজে মুক্তি মেলেনি। টানা দুই বছর কারাবাসের পর ১৯৯৫ সালে এক অদ্ভুত শর্তে তিনি মুক্ত বাতাসের স্বাদ পান। “ঢাকা ছাড়তে হবে, রাজনীতি করতে হবে অন্য কোথাও।”

 

পশুর যেমন স্থান পরিবর্তন হলেও স্বভাব বদলায় না, তার ক্ষেত্রেও তাই হলো। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত এক নির্বাচনে জিতে তিনি সরাসরি ঢুকে পড়লেন ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্রে, সংসদ ভবনে।

 

কিন্তু হিং’স্র’তার ক্ষুধা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল বিদেশের মাটিতেও। ২০০০ সাল। লন্ডনের একটি রেস্টুরেন্টে এক সাধারণ কর্মীকে হ’ত্যা’র হু’ম’কি দিয়ে বসেন এই নবনির্বাচিত সাংসদ। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে আটক হয়ে এবার মুচলেকা দিয়ে কোনোমতে মান বাঁ’চি’য়ে দেশে ফেরেন।

 

২০০১ সাল। আবারও জয়ী হয়ে তিনি ফিরলেন নিজের চেনা আঙ্গিনায়। এবার আর তিনি কারো জুনিয়র নন। নিজস্ব স’শ’স্ত্র বাহিনী, দখলদারিত্ব আর চাঁ’দা’বা’জির এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিলেন নিজের চারপাশে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি তখন এক ত্রাসের নাম। যে তরুণ একদিন কান ধরে ওঠবস করেছিল, ক্ষমতার মোহে সে তখন পুরো এলাকার ভাগ্যবিধাতা সেজে বসেছে।

 

এই উত্থানের প্রতিটি পাতায় লেগে আছে লা’শে’র গন্ধ আর গু’মের আ’ত’ঙ্ক। আশির দশকের সেই বহিষ্কৃত ছাত্রটি থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার এই যাত্রাটি কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার ছিদ্রপথ, যেখানে আইন আর অপরাধের সীমারেখা বারবার মুছে গেছে র’ক্তে’র কালিতে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

একটি বাস্তব গল্প

Update Time : 10:27:16 am, Friday, 24 April 2026

সেপ্টেম্বরের সেই দিনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ ছিল গুমোট। ১৯৮৭ সাল। লাইব্রেরির শান্ত পরিবেশ আর মধুর ক্যান্টিনের আড্ডার সমান্তরালে ক্যাম্পাস তখন বা’রু’দে’র গন্ধে ভারী। ঠিক সেই সময়েই ছাত্ররাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে এক ছায়া-মানবের।

 

১৭ সেপ্টেম্বর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো। অপরাধ? সাধারণ কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, সরাসরি স’ন্ত্রা’সী কর্মকাণ্ড। কিন্তু এটা তো ছিল কেবল ভূমিকা মাত্র।

 

১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। কুয়াশাচ্ছন্ন এক ভোরে ক্যাম্পাসে পাওয়া গেল এক ছাত্রনেতার নি’থ’র দেহ। তদন্তের আঙুল উঠলো সেই বহিষ্কৃত তরুণের দিকে। এটিই ছিল রাজনীতির দাবার বোড় হিসেবে তার প্রথম ‘কি’লিং মিশন’-এর তকমা।

 

এর ঠিক এক বছর পর, ১৯৮৯ সালের ২৯ নভেম্বর, ডাকসু কার্যালয় কেঁপে উঠলো আর্তনাদে। তার নেতৃত্বে একদল স’শ’স্ত্র ক্যাডার হামলে পড়ল প্রগতির পতাকাবাহীদের ওপর। ভাঙচু’র, তাণ্ড’ব আর র’ক্তে’র দাগে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, শান্তি নয়, ক্যাম্পাস শাসনের চাবিকাঠি এখন বা’রু’দের দখলে।

 

নব্বইয়ের দশক শুরু হলো এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দিয়ে। তখনো তিনি বড় কোনো ‘ডন’ হয়ে ওঠেননি। প্রভাবশালী বলয়ের কাছে স্রেফ এক জুনিয়র ক্যাডার। রাজনীতির নিষ্ঠুর পরিহাসে একদিন জনসমক্ষেই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো তার দম্ভ।

 

মধুর ক্যান্টিনের সামনে তাকে কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করা হলো। শত শত মানুষের সামনে সেই অপমানিত চোখ দুটো সেদিন হয়তো ভেতরে ভেতরে এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের নীল নকশা আঁকছিল।

 

সেই নীল নকশার বাস্তব রূপ দেখা গেল ১৯৯১ সালে।

 

দুই ছাত্রনেতার র’ক্তে র’ঞ্জি’ত হলো তার হাত। গ্রেপ্তার হলেন তিনি। কিন্তু রাজনীতির অশুভ পর্দার আড়ালের খেলুড়েরা তাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে দেয়নি। মাত্র এক বছরেই বেরিয়ে এলেন লৌহকপাট ভেঙে।

 

১৯৯২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম লো’ম’হ’র্ষ’ক এক রাত। অভিযোগ উঠলো, তিনি নিজেই দুই ছাত্রনেতাকে গু’লি করে হ’ত্যা করেছেন। কিন্তু বীভৎসতার এখানেই শেষ নয়, প্রমাণ লোপাটের জন্য লা’শ দুটি ফেলে আসা হলো একটি হলের অন্ধকার পানির ট্যাংকে। যে ট্যাপের পানি হাজার হাজার ছাত্র পান করে, সেখানে পচছিল দুই তাজা প্রা’ণে’র দেহ।

 

পুলিশি ফাইল বলছে এর আগেও ৩ আগস্ট এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ব’ন্দু’কযু’দ্ধে প্রাণ হা’রা’তে হয়েছিল তার আ’গ্নে’য়া’স্ত্রের গু’লি’তে।

 

একের পর এক পি’স্ত’ল’বাজি আর স’শ’স্ত্র সং’ঘ’র্ষ তাকে ১৯৯৩ সালে পুনরায় রিমান্ডের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এবার আর সহজে মুক্তি মেলেনি। টানা দুই বছর কারাবাসের পর ১৯৯৫ সালে এক অদ্ভুত শর্তে তিনি মুক্ত বাতাসের স্বাদ পান। “ঢাকা ছাড়তে হবে, রাজনীতি করতে হবে অন্য কোথাও।”

 

পশুর যেমন স্থান পরিবর্তন হলেও স্বভাব বদলায় না, তার ক্ষেত্রেও তাই হলো। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত এক নির্বাচনে জিতে তিনি সরাসরি ঢুকে পড়লেন ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্রে, সংসদ ভবনে।

 

কিন্তু হিং’স্র’তার ক্ষুধা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেল বিদেশের মাটিতেও। ২০০০ সাল। লন্ডনের একটি রেস্টুরেন্টে এক সাধারণ কর্মীকে হ’ত্যা’র হু’ম’কি দিয়ে বসেন এই নবনির্বাচিত সাংসদ। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে আটক হয়ে এবার মুচলেকা দিয়ে কোনোমতে মান বাঁ’চি’য়ে দেশে ফেরেন।

 

২০০১ সাল। আবারও জয়ী হয়ে তিনি ফিরলেন নিজের চেনা আঙ্গিনায়। এবার আর তিনি কারো জুনিয়র নন। নিজস্ব স’শ’স্ত্র বাহিনী, দখলদারিত্ব আর চাঁ’দা’বা’জির এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিলেন নিজের চারপাশে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি তখন এক ত্রাসের নাম। যে তরুণ একদিন কান ধরে ওঠবস করেছিল, ক্ষমতার মোহে সে তখন পুরো এলাকার ভাগ্যবিধাতা সেজে বসেছে।

 

এই উত্থানের প্রতিটি পাতায় লেগে আছে লা’শে’র গন্ধ আর গু’মের আ’ত’ঙ্ক। আশির দশকের সেই বহিষ্কৃত ছাত্রটি থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার এই যাত্রাটি কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার ছিদ্রপথ, যেখানে আইন আর অপরাধের সীমারেখা বারবার মুছে গেছে র’ক্তে’র কালিতে।