5:22 pm, Saturday, 18 April 2026

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ: বাংলাদেশের এক অনন্য সংবিধানিক অভিভাবক

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ: বাংলাদেশের এক অনন্য সংবিধানিক অভিভাবক

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি কেবল একজন দক্ষ আইনবিদই ছিলেন না, বরং সংকটে পথ হারানো বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগরও ছিলেন। দেশের ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দু’বার রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান) এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পাইকুড়া ইউনিয়নের পেমই গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা তালুকদার রিসাত আহমেদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও জনহিতৈষী ব্যক্তি। শৈশবে সাহাবুদ্দিন আহমদ তাঁর বোনের বাড়ি নান্দাইলে বেড়ে ওঠেন। তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমদ ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে ড. সিতারা পারভিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন (২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান)। মেজো মেয়ে শাহানা স্মিথ ও ছোট মেয়ে সামিয়া পারভীন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। বড় ছেলে শিবলী আহমদ একজন পরিবেশ প্রকৌশলী এবং ছোট ছেলে সোহেল আহমদ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সাহাবুদ্দিন আহমদের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত মেধাদীপ্ত। ১৯৪৫ সালে নান্দাইলের চণ্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (CSP) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৬০ সালে তিনি বিচার বিভাগে স্থানান্তরিত হন। দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭২ সালে তিনি হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে উন্নীত হন।

১৯৮০ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে তাঁর দেওয়া অসংখ্য রায় মাইলফলক হয়ে আছে। বিশেষ করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত তাঁর রায়টি ঐতিহাসিক, যা বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া শ্রম আইন, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ ও চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি আইন অঙ্গনে আজও সমাদৃত।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। কোনো রাজনৈতিক দলই অন্য দলের মনোনীত ব্যক্তিকে মেনে নিতে পারছিল না। এমন এক ক্রান্তিকালে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের ওপর আস্থা রাখে সব পক্ষ। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেন। এরপর তিনি পুনরায় প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও সততা দিয়ে দেশের মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা অর্জন করেন। বিশেষ করে বিতর্কিত ‘জননিরাপত্তা আইন’-এ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি নিজের নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন, যা তৎকালীন সরকারের সাথে তাঁর কিছুটা দূরত্ব তৈরি করলেও জনমনে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।

২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে এই মহান রাষ্ট্রনায়ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনানী কবরস্থানে প্রিয়তমা স্ত্রীর কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ডিউটিরত অবস্থায় মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করলেন পুলিশ সদস্য

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ: বাংলাদেশের এক অনন্য সংবিধানিক অভিভাবক

Update Time : 08:15:20 am, Sunday, 8 March 2026

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ: বাংলাদেশের এক অনন্য সংবিধানিক অভিভাবক

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি কেবল একজন দক্ষ আইনবিদই ছিলেন না, বরং সংকটে পথ হারানো বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগরও ছিলেন। দেশের ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দু’বার রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান) এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পাইকুড়া ইউনিয়নের পেমই গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা তালুকদার রিসাত আহমেদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও জনহিতৈষী ব্যক্তি। শৈশবে সাহাবুদ্দিন আহমদ তাঁর বোনের বাড়ি নান্দাইলে বেড়ে ওঠেন। তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমদ ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে ড. সিতারা পারভিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন (২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান)। মেজো মেয়ে শাহানা স্মিথ ও ছোট মেয়ে সামিয়া পারভীন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। বড় ছেলে শিবলী আহমদ একজন পরিবেশ প্রকৌশলী এবং ছোট ছেলে সোহেল আহমদ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সাহাবুদ্দিন আহমদের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত মেধাদীপ্ত। ১৯৪৫ সালে নান্দাইলের চণ্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (CSP) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৬০ সালে তিনি বিচার বিভাগে স্থানান্তরিত হন। দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭২ সালে তিনি হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে উন্নীত হন।

১৯৮০ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে তাঁর দেওয়া অসংখ্য রায় মাইলফলক হয়ে আছে। বিশেষ করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত তাঁর রায়টি ঐতিহাসিক, যা বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া শ্রম আইন, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ ও চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি আইন অঙ্গনে আজও সমাদৃত।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। কোনো রাজনৈতিক দলই অন্য দলের মনোনীত ব্যক্তিকে মেনে নিতে পারছিল না। এমন এক ক্রান্তিকালে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের ওপর আস্থা রাখে সব পক্ষ। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেন। এরপর তিনি পুনরায় প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও সততা দিয়ে দেশের মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা অর্জন করেন। বিশেষ করে বিতর্কিত ‘জননিরাপত্তা আইন’-এ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি নিজের নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন, যা তৎকালীন সরকারের সাথে তাঁর কিছুটা দূরত্ব তৈরি করলেও জনমনে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।

২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে এই মহান রাষ্ট্রনায়ক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনানী কবরস্থানে প্রিয়তমা স্ত্রীর কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।